আজ আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম ভারতবর্ষের শেষ সীমানা, হাকিমপুর বর্ডারের এক অসহায় ও অবহেলিত পরিবারের কাছে। সেখানে গিয়ে যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো মানব জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়। আজকের এই পরিবারটির কষ্টের গল্পও ঠিক তেমনই।
ছোট্ট একটি পরিবার। একজন বৃদ্ধ মা আর তার একমাত্র ১৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে তাদের জীবন সংগ্রাম। পৃথিবীতে আপন বলতে এই দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মেয়েটি মানসিক প্রতিবন্ধী। নিজের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা তার নেই। কখনো হঠাৎ চিৎকার করে, কখনো দৌড়ে চলে যেতে চায়, কখনো নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তাই অসহায় মা বাধ্য হয়ে নিজের বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে মেয়েটিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন।
এই দৃশ্য দেখে সত্যিই চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন। একটি মেয়ে, যার বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, বন্ধুদের সাথে হাসিখুশি থাকার কথা, সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করার কথা—সে আজ শিকলের মধ্যে বন্দি। আর একজন মা, যিনি নিজের সন্তানের সুখের জন্য পৃথিবীর সব কষ্ট সহ্য করতে পারেন, সেই মা আজ নিজের হাতে মেয়েকে বেঁধে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?
বৃদ্ধ মায়ের শরীরও আর আগের মতো নেই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। চোখে কম দেখেন, ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। তবুও প্রতিদিন নিজের মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। সংসারে রোজগার করার মতো কেউ নেই। কোনো জমি নেই, কোনো কাজ নেই, কোনো নির্দিষ্ট আয়ের পথ নেই। পাড়ার মানুষ কেউ একটু চাল দেয়, কেউ একটু ডাল দেয়, কেউ পুরোনো কাপড় দেয়—সেই সাহায্য দিয়েই কোনোভাবে তাদের দিন চলে যায়।
অনেক দিন এমনও যায়, যেদিন তারা দুবেলা ঠিকমতো খেতেও পারেন না। কখনো শুধু পানি খেয়ে রাত কাটাতে হয়। ঘরটিও খুবই জরাজীর্ণ। বৃষ্টির দিনে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, শীতের রাতে ঠান্ডায় কাঁপতে হয়। চারপাশে দারিদ্র্য আর অসহায়ত্ব যেন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে।
কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও এই বৃদ্ধ মা তার মেয়েকে ছেড়ে যাননি। নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আগলে রেখেছেন তাকে। একজন মায়ের ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে, আজ সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখে আমরা সত্যিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি।
আমরা “ফেলে আসা স্মৃতি ফাউন্ডেশন” এর পক্ষ থেকে এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর ছোট্ট চেষ্টা করেছি। কিছু খাদ্যসামগ্রী, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং সামান্য সহায়তা তুলে দিয়েছি তাদের হাতে। আমাদের এই সামান্য সাহায্য পেয়ে বৃদ্ধ মায়ের চোখ ভিজে উঠেছিল। বারবার শুধু একটি কথাই বলছিলেন—“আল্লাহ তোমাদের ভালো রাখুক বাবা।”
সত্যি বলতে, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমরা হয়তো খুব বড় কিছু করতে পারিনি, কিন্তু একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র একদিনের সাহায্যে এই পরিবারের জীবন বদলে যাবে না। তাদের প্রয়োজন নিয়মিত সহযোগিতা, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা এবং মানুষের ভালোবাসা। আমরা যদি সবাই নিজের অবস্থান থেকে একটু একটু করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে হয়তো এই মা-মেয়ের জীবনে একটু স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
আজ আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, যারা প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করি। অথচ আমাদের আশেপাশেই এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যারা একবেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করছে। আমরা যদি চাই, তাহলে খুব সহজেই কারো মুখে হাসি ফোটাতে পারি। একটি ছোট্ট সাহায্য, একটি ভালোবাসার হাত, একটি মানবিক উদ্যোগ—এসবই বদলে দিতে পারে একটি অসহায় পরিবারের জীবন।
আসুন, আমরা সবাই মানবতার পাশে দাঁড়াই। ধর্ম, বর্ণ, দেশ কিংবা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
এই অসহায় বৃদ্ধ মা ও তার মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়েটির জন্য আপনাদের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ—যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। হয়তো আপনার সামান্য সহযোগিতাই তাদের জীবনে নিয়ে আসবে নতুন আশার আলো।
আপনার একটু সাহায্য হতে পারে—
একবেলার খাবার,
একটি কম্বল,
একটি নিরাপদ আশ্রয়,
অথবা একটি অসহায় মায়ের মুখের হাসির কারণ।
মানুষ মানুষের জন্য—এই বিশ্বাস নিয়েই “ফেলে আসা স্মৃতি ফাউন্ডেশন” সবসময় অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে এখনও অনেক ভালো মানুষ আছেন, যারা অন্যের কষ্ট দেখে এগিয়ে আসেন।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াই। কারণ আজ তারা অসহায়, কাল হয়তো আমরাও হতে পারি। মানবতা কখনো হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। ❤️
— ফেলে আসা স্মৃতি ফাউন্ডেশন